x

Tbari

Tbari.com-এ আপনাকে স্বাগতম।

"জকিগঞ্জের মাটি ও মানুষের প্রতিচ্ছবি"

জকিগঞ্জ

Tbari

জকিগঞ্জের ইতিহাস, সংস্কৃতি, উন্নয়ন, নাগরিক অধিকার ও প্রবাসী অবদান তুলে ধরার একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম।"

শিরোনাম ::
শিরোনাম ::

বিশ্বশক্তির টানাপোড়েনে বাংলাদেশ-ঢাকার কূটনৈতিক ‘ব্যালান্সিং অ্যাক্ট’-এর কেন্দ্রে জাতীয় স্বার্থ?

পুবের আলো ডেস্ক :
প্রকাশঃ
প্রসেসিং হচ্ছে, দয়া করে অপেক্ষা করুন...

 


অধ্যাপক ড. তৌফিকুল ইসলাম মিথিল: আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েন যখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের সামনে একের পর এক আসছে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেওয়া উষ্ণ চিঠি, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে ভারতের অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশি জ্বালানি বহনকারী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিয়ে ইরানের আশ্বাস তিনটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ঘটনা হলেও এগুলোকে একসঙ্গে পড়লে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা দৃশ্যমান হচ্ছে।

‎
‎সেটি হলো, কোনো একটি শক্তির বলয়ে আবদ্ধ না থেকে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা।
‎
‎শিক্ষাবিদ ও রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মো. তৌফিকুল ইসলাম মিথিল মনে করেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে শক্তিশালী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করছে।
‎
‎ট্রাম্পের চিঠি: কূটনীতিতে উষ্ণতার নতুন বার্তা:-
‎গত ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো চিঠিতে তাঁর সঙ্গে ‘খুব শিগগির’ সাক্ষাতের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উষ্ণ শুভেচ্ছা জানিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ট্রাম্প কৃতজ্ঞতাও জানান।
‎
‎চিঠিটির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য কেবল সৌজন্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধ নয় এমনটাই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদার। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, তৈরি পোশাক, বিমান চলাচল, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক ভূ-রাজনীতি বহু ক্ষেত্রেই ঢাকা-ওয়াশিংটনের সম্পর্কের গুরুত্ব বাড়ছে।
‎
‎তবে এই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে, বাংলাদেশ কতটা নিজের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারে।
‎
‎দিল্লির অবস্থান: অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ নয়:-
‎বাংলাদেশের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বরাবরই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, জ্বালানি ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে।
‎
‎এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার ভারতের অবস্থানকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
‎
‎এর আগে ভারতের হাইকমিশনারও বলেছিলেন, বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারত নিজেকে দূরে রাখতে চায় এবং পারস্পরিক স্বার্থ ও সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক বিস্তৃত করতে চায়।
‎
‎সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও দুই দেশের জন্যই স্থিতিশীল ও কার্যকর সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার প্রতি সম্মান দ্বি-পক্ষীয় সম্পর্কের নতুন ভিত্তি হতে পারে।
‎
‎হরমুজে বাংলাদেশের জাহাজ: অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত কূটনীতি:-
‎বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এসেছে তেহরান থেকে.....!
‎
‎০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি জানান, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাংলাদেশি জ্বালানি বহনকারী জাহাজে কোনো বাধা সৃষ্টি করা হবে না।
‎
‎এর আগে হরমুজ সংকটের সময় বাংলাদেশকে জ্বালানি বহনকারী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়েছিল। এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সরকার হরমুজ দিয়ে বাংলাদেশগামী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য তেহরানের সহযোগিতা চেয়েছিল।
‎
‎অর্থাৎ বিষয়টি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত জ্বালানি নিরাপত্তা, আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যবস্থা এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
‎
‎বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজে সাম্প্রতিক সময়ে নৌযান চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য নিজস্ব জাহাজ ও জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
‎
‎তিন শক্তির তিন বার্তা:এক জায়গায় বাংলাদেশের স্বার্থ:-
‎👉 ওয়াশিংটনের বার্তা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
‎
‎👉 দিল্লির বার্তা প্রতিবেশী সম্পর্ক ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তাৎপর্যপূর্ণ।
‎
‎👉 আর তেহরানের বার্তা সরাসরি জ্বালানি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
‎
‎তিনটি ক্ষেত্র আলাদা হলেও বাংলাদেশের জন্য একটি অভিন্ন প্রশ্ন সামনে আসে....!
‎
‎বাংলাদেশ কি তার পররাষ্ট্রনীতিতে এমন ভারসাম্য ধরে রাখতে পারবে, যেখানে প্রত্যেক রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার থাকবে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থের?
‎
‎অধ্যাপক ড. মো. তৌফিকুল ইসলাম মিথিলের বিশ্লেষণে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করে।
‎
‎‘বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, নির্ভরতা কারও ওপর নয়’ পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কূটনৈতিক কৌশল হতে পারে একক কোনো শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে নিজস্ব প্রয়োজন ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনা করা।
‎
‎এখানে মূল বিষয় "কার পক্ষে" এই প্রশ্ন নয়; বরং "বাংলাদেশের পক্ষে কী" এই প্রশ্নটিই পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা।
‎
‎কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রুর চেয়ে স্থায়ী স্বার্থের গুরুত্বই বেশি।
‎
‎নতুন বাস্তবতায় ঢাকার সামনে বড় পরীক্ষা:-
‎তবে কূটনৈতিক সাফল্যের মূল্যায়ন শুধু বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের উষ্ণ বার্তা কিংবা রাষ্ট্রদূতদের ইতিবাচক বক্তব্য দিয়ে করা যাবে না। এর প্রকৃত পরীক্ষা হবে বাস্তব ফলাফলে।
‎
‎বাংলাদেশ কি তার রপ্তানি বাজার আরও বিস্তৃত করতে পারবে?
‎
‎বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে পারবে?
‎
‎জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে?
‎
‎সীমান্ত ও পানি সমস্যার ন্যায্য সমাধানে অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে?
‎
‎এবং সর্বোপরি-বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখতে পারবে?
‎
‎এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি কতটা কার্যকর।
‎
‎বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে "নতুন কূটনৈতিক আত্মবিশ্বাস" অধ্যাপক ড. মো. তৌফিকুল ইসলাম মিথিলের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাঁর দৃষ্টিতে, বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও জাতীয় স্বার্থকে সামনে রাখার সক্ষমতা বাংলাদেশের কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
‎
‎বিশ্ব যখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য কোনো একক পক্ষের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ সীমিত।
‎
‎বরং কৌশলগত ভারসাম্য, অর্থনৈতিক বাস্তববাদ, সার্বভৌমত্বের প্রতি অটলতা এবং জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বহুমাত্রিক সম্পর্ক এটাই হতে পারে আগামী দিনের বাংলাদেশের কূটনীতির সবচেয়ে কার্যকর পথ।
‎
‎শেষ কথা:-
‎ট্রাম্পের উষ্ণ বার্তা, দিল্লির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অবস্থান এবং হরমুজে বাংলাদেশি জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিয়ে তেহরানের আশ্বাস এই তিনটি ঘটনাকে এক সুতোয় গাঁথলে বাংলাদেশের সামনে একটি সম্ভাবনার ছবি ফুটে ওঠে।
‎
‎বাংলাদেশ হয়তো ধীরে ধীরে এমন এক কূটনৈতিক অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে বন্ধুত্ব থাকবে বহুমুখী, সহযোগিতা থাকবে সবার সঙ্গে কিন্তু সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত মানদণ্ড হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ।
‎
‎এটাই হবে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকার সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সুযোগ।

লেখক: অধ্যাপক ড. তৌফিকুল ইসলাম মিথিল
শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


‎

This theme has been developed by themebari.

একটি মন্তব্য করুন

Follow Our Page